Sunday, March 29, 2020

প্রিয়_প্রিয়তমা - রিপন গোপ পিন্টু


১ম পর্ব

প্রতিদিনকার মত আজও প্রিয়ম বিকালবেলা টিউশন করানোর জন্য ছাত্র তিয়াসদের বাড়ীতে গেলো। টেবিলে বসে আছে ঠিকঠাক যেন কিছু বলতেই পারছিলোনা,এইরকমটা দেখে তিয়াস তার স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলো স্যার কি হয়েছে আপনার? উত্তরে প্রিয়ম একটা হাঁসি দিয়ে বললো কিছু না। রোদে হেঁটে এসেছে তাই একটু খারাপ লাগছে,তিয়াস বললো ও আচ্ছা। প্রিয়ম তিয়াসকে কিছু না বললেও তিয়াস তার স্যারের এমনটা দেখে বুঝে নিয়েছে নিশ্চয়ই তার স্যারের কিছু একটা হয়েছে। টিউশন শেষে বের হবার আগে প্রিয়ম তিয়াসকে বলেছিলো তার মাকে বলতে যেন আগামীকাল তার চলতি মাসের বেতনগুলা অগ্রিম দেয়। সে বললো ঠিক আছে স্যার আমি মাকে বলে দেবো। টিউশন শেষ করে প্রিয়ম বাড়ীর দিকে ফিরছিলো এমন সময় তার ছোট বোন কল দিয়ে বল্লো ভাই আসার সময় আমার জন্য ২ দিস্তা খাতা,২ টা কলম আর ১ টা পেন্সিল আনিস। কাল স্কুলের কোচিং এর অনেক হোমওয়ার্ক দিয়েছে আগের সব খাতা শেষ। প্রিয়ম বোনকে বললো আচ্ছা ঠিক আছে তুই চিন্তা করিসনা আমি কিছুক্ষন পর তোর খাতা,কলম নিয়ে বাড়ী আসছি। এটা বলে প্রিয়ম প্যান্টের ডান পকেটে হাত দিয়ে টাকা বের করলো দেখে তার পকেটে ১টা ১০০ টাকার নোট,২ টা বিশ টাকার নোট আর ১ টা ১০ টাকার নোট সবমিলিয়ে পকেটে আছে দেড়শো টাকা। কালকের কথা বা কোনো কিছু না ভেবে সে লাইব্রেরীতে গিয়ে তার বোনের জন্য ২ দিস্তা খাতা,২ টা কলম ও ১ টা পেন্সিল নিলো। বিল আসলো ৪৫ টাকা,পকেটে আর রইলো ১০৫ টাকা। খাতা কলম নিয়ে প্রিয়ম বাড়ীতে ফিরলো আর বোনের হাতে দিয়ে বললো নে ধর তোর কাগজ, কলম সব ঠিকঠাকভাবে লিখে শেষ কর কালকের কাজ। আর তাড়াতাড়ি  শেষ কর ভাই-বোন একসাথে রাতের খাবার খেতে হবে আবার। তার বোন খুশি মনে পড়ার টেবিলে গিয়ে তাড়াতাড়ি বসে পড়লো আবার আর কালকের কাজ শুরু করে দিলো। বাড়ীর কাজ শেষে রাতে ভাই-বোন একসাথে খেয়ে শুয়ে পড়লো। সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাই-বোন ফ্রেশ হয়ে আবার একসাথে নাস্তা করলো। নাস্তা করা শেষে বোন স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে স্কুলে চলে গেলো। আর প্রিয়ম ঘর থেকে বের হয়ে ট্রেনের রাস্তার দিকে হাঁটতে বের হলো এমন সময় তার ছাত্র তিয়াস তাকে কল দিয়ে বললো স্যার আজকে পড়াতে ৫ টার বদলে ৩ টায় আসিয়েন। আমরা বিকালে বাসা থেকে বের হবো অন্য জায়গায় যাবো। প্রিয়ম মনে মনে খুশি আবার চিন্তিতও।  এমনিতে সে আজ টিউশনে প্রতিদিনের চেয়ে ঘন্টাখানেক আগে যেতো কারন আজ বিকালবেলা সে প্রিয়ন্তীকে নিয়ে শপিং এ যাবার কথা ছিল। খুশি হলো এই ভেবে যে আগে গিয়ে যদি বেতনটা পেয়ে যায় তাহলে তার চিন্তাটাও দূর হবে। পকেটে ১০০ টাকার ১টা নোট.............


২য় পর্ব

পকেটে ১০০ টাকার ১টা নোট আর খুচরো পয়সা রয়েছে। আজ টিউশনির টাকাটা পাবার কথা রয়েছে, সে আগে থেকে বলে রেখেছে। কিন্তু প্রিয়ন্তীর সাথে শপিং এ যাবার কথাও আগে থেকে ঠিক করা ছিলো। প্রিয়ম প্রিয়ন্তীকে ফোন করে বললো আমাকে হঠাৎ দুপুরের পর পর পড়াতে যেতে বলেছে। তুমি না'হয় তোমার মাকে নিয়েই যাও। সে অবশ্য প্রিয়মকে একবার বলেছিলো কোনোভাবে কি বিকালে যাওয়া যায় না পড়াতে? তবে কোনপ্রকার জোর করেনি। পড়াতে না গিয়েও যে উপায় নেই। টাকাটা যে খুব দরকার। ওর সাথে বিকালে ঘুরবো। ওকে তো কিছু দিতে হবে। রাতে আবার ওর মা তাদের বাসায় যেতে বলছে। প্রিয়ন্তীর মা একটু আধটু জানে ওদের কথা। খালি হাতে তো আর ওদের বাসায় যাওয়া যায় না। এইসব ভাবতে ভাবতে দুপুরে খাওয়ার পর যে বিছানায় প্রিয়ম একটু শুয়ে ছিলো তাতে হঠাৎ কখন ঘুমে ধরে গেলো। জেগে উঠে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখে তখন ৩ টা বেজে ২০ মিনিট। এরপর অনেক তাড়াহুরো করে টিউশনের জন্য ঘর থেকে বের হলো হাটতে লাগলো। পড়াতে যেতে যে দেরি হয়ে গেলো। প্রিয়ম তিয়াসদের বাসায় পৌছে দেখে ঘড়িতে ৩ টা বেজে ৪০ মিনিটেরও বেশি। তখন তারা বাসা থেকে বের হচ্ছে। আন্টি বললো বাবা আজ আর পড়াতে হবেনা আমরা বের হয়ে যাচ্ছি, তুমি বরং কাল এসো। তখন আন্টির মুখের উপর সে আর বেতনের কথাটাও বলতে পারেনি। শুধু সে হু বলে চলে আসলো। আর বাসা থেকে বের হয়ে সে প্রিয়ন্তীকে কল দিলো আর প্রিয়ন্তী বললো সে নাকি শপিং এ যায়নি।
সন্ধ্যাবেলা প্রিয়ম তিয়াসকে কল দিয়ে বললো তাকে টাকাটা বিকাশ করতে পারবে কিনা। আর যদি না পারে তাহলে সে বাসায় গিয়ে নিয়ে আসবে। তিয়াস উত্তরে বললো তার বাবা মা নাকি হঠাৎ করে গ্রামের বাড়ী গেছে দাদু অসুস্থ তাকে দেখতে। টাকা রেখে যায়নি। টাকা গিফট সব আশা হাতছাড়া করে ট্রেনের রাস্তার ধারে চাঁয়ের দোকানে চেয়ারে বসে আছে। তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা এমন সময় তার কাছে ফোন এলো  পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখে প্রিয়ন্তীর কল। বললো সে নাকি ২০ মিনিট পর রিকশা নিয়ে বাড়ীর সামনে দিয়ে আসবে। সে হঠাৎ আচমকিত হয়ে চেয়ার থেকে উঠে দাড়ালো আর বাড়ির গেইটের দিকে যেতে উদ্দূত হলো। জামাটাও পাল্টানোর সে সময় পায় নি দুপুরে ঘুম থেকে উঠে দুমড়ানো,মোচড়ানো জামা নিয়ে টিউশনিতে গিয়েছিলো। জামাটা ইস্ত্রি করতে তার একদম খেয়াল নেই। কিছুক্ষন পর প্রিয়মের বাড়ীর গেইটের সামনে একটা রিকশা আসলো তাতে এক রমণী যাকে দেখে প্রিয়ম অনেকক্ষন শুধু হা করে তাকিয়ে ছিলো। কচি কলা পাতা রঙের একটা শাড়ী পরে এসেছিলো সে। তাকে অদ্ভুত রকমের সুন্দর দেখাচ্ছিল যার থেকে চোখ সরাতে পারছিলোনা প্রিয়ম। তারপর একই রিকশা করে তারা দুইজন গেলো ট্রাস্ট কলেজ রোড়ের দিকে। রাস্তার দুই পাশে নানান রঙ্গের বাতি জ্বলছে আর বিভিন্ন রকম ফুলের বাহারি সৌন্দর্যময়। সেখানে কিছু সুবিধাবঞ্চিত শিশু যেন তাদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। ওদের সাথে নাকি তার আগে থেকে ভাব। কাছে যেতেই তারা প্রিয়ন্তীকে জড়িয়ে ধরে ভাঙা ভাঙা ইংরেজীতে বললো হ্যাপি বার্থডে মিষ্টি দিদি। বাচ্চাগুলা তার জন্য পদ্মের মালা বানিয়েছে। প্রিয়মের জন্যও বানিয়েছে একটা। ওরা নাকি তাকেও চিনে। প্রিয়ন্তী নাকি বাচ্চাগুলাকে তার ছবি দেখিয়েছে। সে তো পুরো অবাক। ওদেরকে মুঠো ভর্তি চকলেট আর চিপস,কেক দিয়ে তারা শহরের দিকে চলে আসলো। তারপর দুজন মিলে শপিংমলে গিয়ে একটা সাদা পাঞ্জাবী কিনলো। পরশু নাকি প্রিয়ন্তীর মামাতো ভাই বাইরে থেকে আসছে,তার জন্য কিনলো। পকেটে এখনো সেই..........


৩য়_পর্ব

পকেটে এখনো সেই ১০০ টাকার নোট নিয়ে ঘুরছে প্রিয়ম। তাকে একপ্রকার জোর করে ফুচকার দোকানে নিয়ে গেলো প্রিয়ন্তী। একটাই চাওয়া তাকে নাকি ফুচকা খাইয়ে দিতে হবে আজ। নিজে হাত দিয়ে একটাও খাবেনা। জোরপূর্বক বিলটা প্রিয়ম দিলো। বড্ড খারাপ লাগছে প্রিয়মের,আজকের দিনেও তার সাথে খালি হাতে দেখা করতে হলো। মোড়ের টং দোকানে ২ টা রং চা খেয়ে রাত ৯ টার দিকে দুজনে তার বাসার দিকে রওনা দিলো। পকেটে আর মাত্র কুড়ি'টা টাকা আছে, তাই আর কিচ্ছু নেবার কথাও মাথায় আসলোনা প্রিয়মের। পথে যেতে প্রিয়ন্তী কিছু ফুল, মিষ্টি আর কিছু ফল নিলো,বললো তার মা নাকি নিতে বলেছে। ওদের বাসায় ডুকতে ওর মা এসে দরজা খুললো। ও মায়ের হাতে মিষ্টি,ফল,ফুলগুলো হাতে দিয়ে বললো, দেখো মা ওকে কতো করে  বললাম এগুলা না আনার জন্য। কিন্তু কিছুতেই আমার কথা শুনলোনা। এইসব শুনে,দেখে প্রিয়ম মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেলো। কিন্তু মুখে শুষ্ক একটা হাসি হাসলো। রুমে ডুকতেই প্রিয়ন্তীর মা বললো আচ্ছা তোরা বসে কথা বল, আমি রান্না ঘরের দিকে যাচ্ছি। প্রিয়মের হাতের কব্জিটা ধরে এক ঝটকায় প্রিয়ন্তী তার রুমে গিয়ে দরজা আটকে বললো, আমি দেয়ালের দিকে মুখ করে দাড়াচ্ছি, তুমি চট করে এই পাঞ্জাবিটা পরে নাও।


৪র্থ ও শেষ পর্ব

প্রিয়ম বলে উঠলো..... মানে কি? ওটা তো তোমার ভাইয়ের!
কিসের ভাই? কোনো ভাই টাই নেই আমার। তোমার জন্য এনেছি। তাড়াতাড়ি পরে নাও, মা একটু পর চলে আসবে।
সে ছোট বাচ্চাদের মত নিশ্চুপ হয়ে পাঞ্জাবিটা পরে নিলো। তারপর প্রিয়ন্তীর মা সহ তারা রাতের খাবার খেলো।  খাওয়া শেষে প্রিয়ম বাড়ীতে আসার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে এলো প্রিয়ম। তখন ঘড়িতে প্রায় ১১ টা বাজে, মনে মনে ভাবছে তার ছোট বোনটা না জানি না খেয়ে বসে আছে তার জন্য। বাসা থেকে আসার সময় তার হাতে একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিলো প্রিয়ন্তী। পকেটের বাকি টাকাটা দিয়ে রিকশা করে বাড়ীতে আসলো প্রিয়ম। ঘরে ডুকে খাঁটে বসে ব্যাগ খুলে দেখে একটা টিফিনবক্স। তার ভিতর খাবার আর উপরে একটা ছোট্ট খাম। খামের ভিতর ৩ টা হাজার টাকার নোট আর ছোট্ট একটা চিরকুট। তাতে লিখা ছিলো খাবারটা ছোট বোনকে পাশে বসিয়ে নিজ হাতে খাইয়ে দিতে,আর অবশ্যই খাওয়ানোর আগে একটু গরম করে নিতে। আর ওই টাকাটা তুমি রাখো কোনো একটা সময় সুদে আসলে সব নেবো কিন্তু। বাকিটা  জীবন তুমি আমার এভাবেই পাশে থেকো। আর রাস্তা পার হবার সময় আমার হাতটা শুধু শক্ত করে ধরো মোর প্রিয়।
ভালোবাসি তোমাকে প্রিয়, বড্ড বেশি ভালোবাসি তোমাকে।

No comments:

Post a Comment